প্রদীপ চন্দ্র মম
মানচিত্রে শহরটির নাম ছিল মহানপুর। সেখানে সবাই মহান—কমপক্ষে নিজেদের পরিচয়ে।
শাসকেরা বলতেন, "আমরাই জনতার অভিভাবক।" কর্তাব্যক্তিরা বলতেন, "আমরাই রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড।" শিক্ষিতেরা বলতেন, "আমরাই বিবেক।" সংবাদবাহকেরা বলতেন, "আমরাই সত্যের কণ্ঠস্বর।"
শুধু সাধারণ মানুষ কিছু বলত না। কারণ তারা জানত, তাদের কথা বলার অধিকার আছে, কিন্তু সেই কথা শোনার মানুষ সব সময় থাকে না।
একদিন শহরে এলো এক অচেনা পথিক। কেউ তার নাম জানত না। প্রথম প্রশ্ন করার পরই শহর তাকে নাম দিল—"বেয়াদব।"
সে শুধু একটি প্রশ্ন করেছিল—
"যদি সত্যিই এত মহান মানুষের হাতে এই শহরের দায়িত্ব থাকে, তবে মানুষের অভিযোগ এত গভীর কেন? কেন প্রতিশ্রুতির চেয়ে হতাশা দ্রুত ছড়ায়? কেন ক্ষমতার করিডোর যত উজ্জ্বল হয়, মানুষের আস্থা তত ম্লান হয়ে যায়?"
প্রশ্ন শেষ হতেই সভাকক্ষ ভারী হয়ে উঠল।
একজন বললেন, "ওকে চুপ করাও।"
আরেকজন বললেন, "ও উন্নয়ন দেখে না।"
তৃতীয়জন বললেন, "ও নেতিবাচক।"
কিন্তু আশ্চর্য—কেউ প্রশ্নটির উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে মহানপুরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিবেকের আয়না হঠাৎ জেগে উঠল। যে-ই তার সামনে দাঁড়াল, নিজের মুখ দেখল না। দেখল অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, অবহেলিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অস্বীকার করা ভুল আর অনুচ্চারিত সত্যের ছায়া।
ভোরের আগে সিদ্ধান্ত হলো—আয়নাটিই ভেঙে ফেলতে হবে।
কারণ আয়না না থাকলে প্রতিবিম্বও থাকবে না—এমনটাই তারা ভেবেছিল।
ঠিক তখনই অচেনা পথিকটি শেষবারের মতো বলল—
"আয়না ভাঙলে মুখ বদলায় না। আলো নিভিয়ে দিলে সূর্য নিভে যায় না। সত্যকে অস্বীকার করলে সত্য মরে না; কেবল মানুষের বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়।"
এরপর সে কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল।
আজও মহানপুরে একটি অলিখিত আইন চালু আছে—
সেখানে প্রশ্নের ওজন প্রায়ই পরিচয়ের চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে। আর মুখোশ যত চকচকে হয়, আয়নার সামনে দাঁড়ানোর ভয়ও তত বেড়ে যায়।