নিজস্ব প্রতিবেদক
সমাজের মানুষ আজ অপরাধীকেই ভয় পায়—এই বাস্তবতা আমাদের জন্য লজ্জাজনক, কিন্তু অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। একসময় অপরাধী আইনকে ভয় পেত, সমাজের বিচারকে সম্মান করত। আর আজ? আজ পরিস্থিতি যেন উল্টো। সাধারণ মানুষ মাথা নিচু করে চলে, আর অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘোরে। কেন এমন হলো? কোথায় আমাদের ভুল?
অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সমাজের প্রতিটি স্তর। আজ মানুষের মূল্যায়ন হয় না তার চরিত্র, সততা বা মানবিকতার ওপর; বরং বিচার হয় তার ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে। যার হাতে অর্থ, তার হাতেই যেন ক্ষমতা। আর এই ক্ষমতার জোরেই অপরাধীরা তৈরি করছে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়। আইন যেন তাদের কাছে এক প্রকার খেলনা—যখন ইচ্ছে ব্যবহার করবে, যখন ইচ্ছে ভেঙে ফেলবে।
সাধারণ মানুষ কেন ভয় পায়? কারণ তারা জানে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ালেও সবসময় ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। একজন নিরীহ মানুষ যখন দেখে, অপরাধী শাস্তি না পেয়ে উল্টো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন তার মনে ভয় জন্মায়। সে ভাবে—“আমি কেন ঝামেলায় যাব?” এই চিন্তাই ধীরে ধীরে সমাজকে দুর্বল করে দেয়। প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, আর অপরাধীরা পেয়ে যায় আরও বড় সুযোগ।
অন্যদিকে, সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী যখন অর্থের লোভে অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ন্যায়বিচার তখন আর নিরপেক্ষ থাকে না। বিচার হয় টাকার বিনিময়ে, প্রভাবের বিনিময়ে। ফলে মানুষ আস্থা হারায় আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর। এই আস্থাহীনতাই সমাজকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে।
তবে প্রশ্ন হলো—এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী? প্রথমত, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। অর্থই সব নয়—এই উপলব্ধি ফিরিয়ে আনতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার থেকেই শুরু হতে হবে পরিবর্তন।
দ্বিতীয়ত, সমাজের সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে, প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। হয়তো শুরুতে ভয় থাকবে, বাধা আসবে, কিন্তু একসাথে দাঁড়ালে ভয় অনেকটাই কমে যায়। ইতিহাস সাক্ষী, ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তির কাছে কোনো অন্যায়ই স্থায়ী হতে পারেনি।
তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে হতে হবে আরও শক্ত, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব দেখে নয়—অপরাধের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যখন মানুষ দেখবে অপরাধীরা সত্যিই শাস্তি পাচ্ছে, তখন তাদের ভয় কমবে, আর সাহস বাড়বে।
সবশেষে বলা যায়, সমাজ কখনোই একদিনে পরিবর্তন হয় না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু শুরুটা আমাদেরই করতে হবে। আমরা যদি অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকি, যদি অর্থের মোহে নিজেদের বিকিয়ে না দিই, তাহলে একদিন অবশ্যই এই সমাজ আবার ন্যায় ও মানবিকতার পথে ফিরবে।
কারণ, ভয় নয়—সত্যই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।