নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় সাংবাদিকতাকে। গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সাংবাদিকতাই সেই শক্তি, যা সমাজের সত্যকে তুলে ধরে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যে পেশাকে এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়, সেই সাংবাদিকরাই কেন আজ অবহেলিত? কেন তাদের জন্য থাকা আইনগুলো বাস্তবে প্রয়োগ হয় না?
একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু খবর লেখা নয়; তিনি সমাজের আয়না। দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার—সবকিছুই জনগণের সামনে তুলে ধরেন তিনি। অথচ এই কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় তাকে হুমকি, নির্যাতন, এমনকি প্রাণনাশের ঝুঁকিও নিতে হয়। বাস্তবতা হলো, দেশে সাংবাদিক সুরক্ষার জন্য আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ খুবই সীমিত।
আইন প্রণয়ন করা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন—এই কথাটি যেন সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযোজ্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলা হয়, কিন্তু বিচার হয় না। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং সাংবাদিকরা হয়ে পড়েন অসহায়।
এ অবস্থার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করলে সাংবাদিকরা চাপে পড়েন। দ্বিতীয়ত, আইনের দুর্বল প্রয়োগ। আইন থাকলেও যদি তা কার্যকর না হয়, তবে সেটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। তৃতীয়ত, সমাজের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকেই সাংবাদিকদের কাজকে যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হন, বরং তাদের বিরোধী পক্ষ হিসেবে দেখেন।
অথচ একটি সুস্থ সমাজ গঠনে স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা অত্যন্ত জরুরি। যদি সাংবাদিকরা ভয়ভীতি বা চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাহলে সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর যখন সত্য চাপা পড়ে যায়, তখন সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতি বেড়ে যায়।
সুতরাং, সময় এসেছে শুধু সাংবাদিকতাকে “চতুর্থ স্তম্ভ” বলে সম্মান জানানোর নয়, বরং তাদের বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত করার। এজন্য প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের প্রতি সহনশীল মনোভাব গড়ে তোলা। সরকার, প্রশাসন এবং সমাজ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকরা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে গণতন্ত্রও নিরাপদ নয়। কারণ, সত্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা যদি নিজেরাই অবহেলার শিকার হন, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এখনই সময়—সাংবাদিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। আসুন আমরা ঐক্য বদ্ধ হয়ে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে সরকারের কাছে জোড়ালো আহবান জানাই।