নিজস্ব প্রতিবেদক
সমাজের এক অদ্ভুত দ্বৈত চেহারা আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রকাশ্যে মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন—অন্যদিকে অন্তরালে সেই মাদক ব্যবসারই নীরব আশ্রয়-প্রশ্রয়। এই বৈপরীত্যই যেন মাদক নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন জাগে—এভাবে কি কখনো মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব?
আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো ঘটনা ঘটলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়, কঠিন শাস্তির দাবি জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই প্রতিবাদের অনেকটাই লোক দেখানো। কারণ, একই সমাজে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আইনের প্রয়োগ যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের আস্থাও কমে যায়।
মাদক ব্যবসা একটি চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এখানে শুধু বিক্রেতা নয়, এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রভাবশালী মহল, অসাধু প্রশাসনিক সহায়তা, এমনকি সমাজের কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণিও। ফলে যখনই কোনো অভিযান চালানো হয়, তখন ছোটখাটো বিক্রেতারা ধরা পড়ে, কিন্তু মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই অসম চিত্রই প্রমাণ করে—সমস্যার গভীরে পৌঁছানো এখনো সম্ভব হয়নি।
তাহলে সমাধান কোথায়?
১ ম: সত্যিকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। শুধুমাত্র বক্তব্য বা স্লোগানে নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। যারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন, তাদের নিজেদের অবস্থানও হতে হবে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত। দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে কোনো আন্দোলনই সফল হবে না।
দ্বিতীয় :, আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপমুক্ত রেখে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৩ তৃতীয় :সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা শুরু করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
৪র্থ: র্বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। অনেক তরুণ বেকারত্বের কারণে মাদক ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের জন্য সঠিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে এই প্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সবশেষে বলতে হয়—মাদক নির্মূল কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা, যেখানে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে।
প্রকাশ্যে প্রতিবাদ আর অন্তরালে প্রশ্রয়ের এই দ্বৈততা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। না হলে মাদক শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ধীরে ধীরে পুরো সমাজকেই গ্রাস করবে। সময় এসেছে ভণ্ডামি ছেড়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার—কারণ মাদকমুক্ত সমাজ গড়া এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে।