নিজস্ব প্রতিবেদক
হে পৃথিবীর আপন মানুষ,
আমি যদি একদিন হঠাৎ চলে যাই, তোমরা হয়তো আমাকে ঠিক ততটাই ভুলে যাবে, যতটা শরতের শেষে গাছ ভুলে যায় ঝরে পড়া পাতাগুলোকে। যে পাতাগুলো একসময় তারই শাখায় দুলত, রোদ আর বৃষ্টির গল্প শুনত, সময়ের বাতাস সেগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
আমি যদি চলে যাই, তোমরা হয়তো আমাকে ততটাই মনে রাখবে, যতটা ভোরের শিশিরকে মনে রাখে দুপুরের রোদ। সূর্যের একটু উষ্ণতা এলেই শিশিরের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়, অথচ রাতভর সে ঘাসের বুকে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করেছে।
আমার যত ত্যাগ, যত বিসর্জন, যত নির্ঘুম রাত—সব হয়তো একদিন নদীর বালুচরে লেখা নামের মতো মুছে যাবে। জোয়ার এসে যেমন সব চিহ্ন গিলে ফেলে, তেমনি সময়ও মানুষের স্মৃতিগুলোকে একদিন নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
আমি ছিলাম হয়তো তোমাদের জীবনের একটি প্রদীপ, যে নিজে জ্বলে আলো দিয়েছে। কিন্তু প্রদীপ নিভে গেলে মানুষ আলোটুকু মনে রাখে, প্রদীপটাকে নয়। আমি ছিলাম হয়তো বর্ষার মেঘ, যে নিজের বুক খালি করে অন্যের জমিনে সবুজের স্বপ্ন বুনেছে। কিন্তু ফসল ঘরে উঠলে কয়জন মনে রাখে সেই মেঘের কথা?
কখনো কখনো মনে হয়, আমি যেন পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো বটগাছ। কত মানুষ তার ছায়ায় বিশ্রাম নেয়, ক্লান্তি দূর করে, আবার পথ চলতে শুরু করে। কিন্তু খুব কম মানুষই ফিরে এসে দেখে, গাছটা কেমন আছে।
তবু একটি প্রশ্ন বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে—আমি যতদিন আছি, ততদিন কি আমাকে একটু ভালোবাসা যায় না? মানুষ মরে গেলে তার কবরে ফুল দেওয়া হয়, অথচ বেঁচে থাকতে তার হাতে একটি ফুল তুলে দেওয়ার মানুষ পাওয়া যায় না কেন?
আমি চাই না মৃত্যুর পরে স্মরণসভা হোক। চাই না আমার নামে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়া হোক। আমি শুধু চাই, আমার জীবিত দিনগুলোতে তোমাদের হৃদয়ের আকাশে আমি একটি ক্ষুদ্র তারার মতো জ্বলতে পারি। কারণ মরে যাওয়ার পর স্মৃতি হওয়া সহজ, কিন্তু বেঁচে থাকতে কারও ভালোবাসা হয়ে ওঠা বড় কঠিন।
একদিন সময়ের ধুলো আমার নাম ঢেকে দেবে। তোমাদের ব্যস্ততার সমুদ্রে আমি হারিয়ে যাব একটি বিন্দু জলের মতো। তবুও আজ, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের বিকেলে, আমি শুধু একটু মায়া চাই, একটু ভালোবাসা চাই।
কারণ কবরের ফুলের কোনো ঘ্রাণ মৃত মানুষ পায় না; কিন্তু বেঁচে থাকতে পাওয়া একফোঁটা ভালোবাসা পুরো জীবনকে বসন্তের বাগানে পরিণত করে দিতে পারে।
এখন একটু ভালো বাসো আমায়-"তোমরা তো ভুলেই যাবে আমায়"।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর