প্রদীপ চন্দ্র মম
আমরা উঁচু সেতু বানাই,
মেট্রোরেলের কাঁচে উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি আঁকি,
কিন্তু মানুষের চিন্তার দরজায়
এখনো ভয় আর কুসংস্কারের মরিচা ধরা তালা ঝুলিয়ে রাখি।
আমরা শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখাই না,
শেখাই আনুগত্য।
শেখাই—
বইয়ের আগে অন্ধ অনুকরণ,
যুক্তির আগে ভয়,
মানুষের আগে পরিচয়।
জন্মের সময় কেউ ধর্ম নিয়ে আসে না,
কেউ রাজনৈতিক পতাকা হাতে আসে না,
কেউ ঘৃণার অভিধান মুখস্থ করে আসে না।
আমরাই তাদের কানে কানে বলি—
"ওরা আলাদা",
"ওদের ভয় পেতে হয়",
"ওদের ঘৃণা করতে হয়"।
তারপর নিজেদের সভ্য বলে পরিচয় দিই।
এ দেশে এখনো নারীর পোশাকের বিচার হয়,
পুরুষের চরিত্র নয়।
ধর্ষণের বিচারের মঞ্চে
কাঠগড়ায় দাঁড়ায় ভুক্তভোগী,
অপরাধী নয়।
মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে সভা বসে,
কিন্তু পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে
নীরবতা পালন করা হয়।
এখানে দুর্নীতি শুধু লেনদেন নয়—
এটি এক সামাজিক সংস্কৃতি,
বিবেক বিক্রির শিল্প,
ক্ষমতার সামনে নতজানু হওয়ার দীর্ঘ অভ্যাস।
অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে
নিজেকে ভালো মানুষ ভাবার অভিনয়।
এখানে প্রশ্নকারীকে বলা হয় বিপথগামী,
সমালোচককে বলা হয় শত্রু,
ভিন্নমতকে বলা হয় ষড়যন্ত্র,
আর অন্ধ অনুসারীকেই বলা হয় আদর্শ নাগরিক।
যে জাতি বইকে ভয় পায়,
শিল্পকে সন্দেহ করে,
বিজ্ঞানের বদলে অলৌকিকতায় আশ্রয় খোঁজে,
সমালোচনাকে অপরাধ মনে করে—
সে জাতি যত উঁচু ভবনই তুলুক,
সভ্যতার সিঁড়িতে তার অবস্থান নিচেই থেকে যায়।
আমরা উন্নয়ন চাই,
কিন্তু মুক্ত চিন্তা চাই না।
গণতন্ত্র চাই,
কিন্তু ভিন্নমত চাই না।
আইনের শাসন চাই,
কিন্তু আইন যেন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে—তা চাই না।
সমতা চাই,
কিন্তু নিজের বিশেষ সুবিধার সিংহাসন ছাড়তে চাই না।
সভ্যতা কেবল অর্থনীতির গ্রাফ নয়।
সভ্যতা হলো—
একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের নির্ভয়ে ঘুমানো,
একজন নারীর নিরাপদে পথ চলা,
একজন লেখকের ভয়হীন লেখা,
একজন শিশুর অবাধে প্রশ্ন করা।
দারিদ্র্য আছে,
বৈষম্য আছে,
সম্পদের সীমাবদ্ধতাও আছে;
তবু আমাদের গভীরতম সংকট—
চিন্তার স্বাধীনতাকে ভয় পাওয়া।
বাংলাদেশ,
তুমি ঠিক করো—
তুমি কি এমন এক রাষ্ট্র হবে,
যেখানে মানুষ জন্মের আগেই পরিচয়ের কারাগারে বন্দী হয়?
নাকি এমন এক দেশ,
যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে—
সে মানুষ।
কারণ ইতিহাস নির্মম।
সে ক্ষমতাবানদের ভাষণ মনে রাখে না,
মনে রাখে মানুষের সাহস।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত এ-ই লিখে রাখে—
একটি জাতি ভয়কে উত্তরাধিকার বানিয়েছিল,
নাকি তার সন্তানদের হাতে
একটি প্রদীপ তুলে দিয়েছিল।